ভবঘুরে ।। পর্ব-২ ।।

রাতে হাঁটতে বের হওয়ার অভ্যাসটা অনেকদিনের। আরামবাগ মোড়ে দাড়িয়ে চা না খেলে রাতে কোন ভাবেই যেন ঘুমের দেখা পাওয়া যায় না। চা খাওয়ার বিষয়টা থাকলেও উদ্দেশ্যটা আসলেই ভিন্ন ছিলো। চায়ের দোকানটা ছিলো আমার জন্য খুব উপযোগী। একটু ঘুরে দাড়ালেই অপজিটের বাড়ির দোতলার বেলকুনিতে চোখ রাখা যায়।
ওই দোকানটায় দাড়িয়ে চা খাওয়ার সময় এখনো দোতলার বেলকুনিতে চোখ চলে যায়। মাঝে মাঝে নীল শাড়ি জড়ানো কাউকে দেখা যায়। যেটা সম্পূর্ণ দৃষ্টিভ্রম। তারপরও তাকিয়ে থাকি।
.

পরিচিত মহলের অনেকেরই লোভ হয় আমার সাথে রাতে হাঁটতে বের হওয়ার। কিছুদিন ধরে হাঁটার সঙ্গী হিসাবে ছিলো সাইফুল নামের এক ছোট ভাই। আড্ডা দেয়ার জন্য পারফেক্ট সঙ্গী বলতে হবে। মাঝে মাঝে সাইফুল ছাড়াও অনেকে আমার সাথে বের হয়। দল কখনোই ভারী করি না, বেশি লোক হলে হেঁটে মজা থাকে না। যদিও একা হাঁটার মজা সবচেয়ে বেশি। আজ সন্ধ্যার পরে আমার সাথে ছিলো সোহরাব মাহাদী নামে এক বন্ধু, বন্ধু বললে ভুল হবে, বন্ধুর চেয়েও খুব কাছের একজন মানুষ।
.
হাঁটা শুরু হয় আরামবাগ থেকে, হাঁটতে হাঁটতে বিজয়নগর, কাঁকরাইল পাড় হয়ে রমনার পাশ দিয়ে শাহবাগ। শাহবাগে বসে ছিলাম অনেকক্ষন। আড্ডা গল্প যেন শেষ হয় না। এবার রাস্তার পাড়ে বসে চা খাই, আবার ওই পাড়ে গিয়ে চা খাই। সাংগঠনিক গল্প থেকে শুরু করে ভুতের গল্প, কিছুই বাদ ছিলো না।
একবার রাস্তা পাড় হতে গিয়ে রাস্তার মাঝে দুজন আটকে গেলাম। ডানে বামে দুই পাশেই গাড়ী। মুভ করার কোন সুযোগ নাই।
তামিল একটা মুভিতে দেখছিলাম, একটা মাছি ট্রাফিক পুলিশকে বিরক্ত করছে। ট্রাফিক মাছি তাড়াতে হাত নাড়ে, তাতেই সবগুলো লেন থেকে একসাথে গাড়িগুলো ছেড়ে দেয়। ঠিক ওই রকম ভাবেই সবগুলো লেনের গাড়ি ছেড়ে দেয়ার মত অবস্থা। যার মধ্য মনি হয়ে আছে সাদা রংএর খুব দামী একটা গাড়ী। আমি আর সোহরাব মাহাদী ওই দামী গাড়ীটার পাশেই আটকে ছিলাম।
.
আমি মনে মনে এই অবস্থার জন্য ট্রাফিক পুলিশকেই দায়ী করতে ছিলাম। কিন্তু একটু পরে বুঝলাম, ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করেই এই গাড়ীটা ছুটতে শুরু করে, তার পেছন পেছন অন্য গাড়ীগুলো। একজন ট্রাফিক পুলিশ এসে গাড়ীর ড্রাইভারের সাথে কথা বলার চেষ্টা করছে। স্বাভাবিক ঘটনা আমাদের সবারই জানা, গ্লাস খুলে ড্রাইভার ৫০/১০০ টাকা দিয়ে দিবে, ঘটনা শেষ।
.
কিন্তু না, ঘটনা ভিন্ন। ট্রাফিক পুলিশ সরাসরি চোখ গরম করে ড্রাইভারকে হিট করলো। ড্রাইভারও গাড়ী সাইট করতে রাজি না। বুঝলাম, দামী গাড়ীর ড্রাইভার, ক্ষমতাও অনেক দামী। কথায় আচ্ছে না, নেতার বাড়ীর কুকুরটাও নেতা নেতা ভাবে চলে।
পুলিশ ভাইকে দেখলাম গাড়ীর সামনে দাড়িয়ে রইলো। অবস্থা এমন, যেতে চাইলে আমার বুকের উপর দিয়ে যা।
আমার ফোনে চার্জ নেই, সোহবার মাহাদীকে বললাম ছবি তোলেন। সোহরাব মাহাদীও সাংবাদিক মানুষ, বেশি বলতে হলো না, একবারেই বুঝলো। কিন্তু ছবি তুলতে তুলতে দৃশ্য পরিবর্তন হয়ে গেছে। গাড়ী দাড়িয়ে আছে। ট্রাফিক পুলিশ গাড়ীর কাগজপত্র হাতে নিয়ে হাঁটা শুরু করছে। আমাদের সামনে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন, তার ছবি তুলতে চাইলে একটু হাসি দিয়ে বলেন- ছবি তুলতে হবে না।
.
একটু পরে দেখলাম সে একটা লেনের সামনে দাড়িয়ে কঠোর ভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। মনেই হচ্ছে না একটু আগে কিছু একটা হচ্ছে। বাম হাতে ইশারা করে আছে, আর ডান হাতে সাদা রংএর দামী গাড়ীর কাগজপত্র।
.
মাঝে মাঝে পুলিশের ভীরুতা কিংবা অসৎ কিছু নিয়ে খবর শোনা যায়, এই খারাপ খবরগুলোর কারণে সাহসীকতার খবরগুলো চাপা পরে যায়। আমার খুব ইচ্ছা ছিলো ট্রাফিক পুলিশ ভাইকে গিয়ে সালাম দিয়ে জড়িয়ে ধরি, তারপর চা খাওয়ার নিমন্ত্রন জানাই।
হ্যাঁ, চা শেষ করেই কিন্তু যেতে দিবো না, সোহরাবকে বিদায় জানিয়ে তাকে নিয়ে হাঁটা শুরু করবো। হাঁটতে হাঁটতে চলে আসবো আরামবাগ, ঠিক এখন যেখানটায় আছি। আর এখানে দাড়িয়ে চোখ রাখবো দোতলা বাড়িটার দিকে। তাকে জিজ্ঞাস করবো দোতলার বেলকুনিতে নীল শাড়ী জড়ানো কাউকে দেখতে পাচ্ছেন কিনা?
বলবে, ওটা তোমার দৃষ্টিভ্রম, আর বেলকুনিতে কেউ নাই।
তারপর শুরু হবে নীলাকে নিয়ে গল্প। সব বলবো তাকে, এরকম মানুষের সাথে হারানো অতীত নিয়ে গল্প করে বেশ আড্ডা জমানো যায়