ভবঘুরে ।। পর্ব-১ ।।

ভবঘুরে। নিজেকে ভবঘুরে ভাবতে একটুও খারাপ লাগে না। উদ্দেশ্যহীন ভাবে পথে পথে ঘুরে বেড়ানো থেকেই হয়তো আমার সাথে ভবঘুরে শব্দটা লেগে আছে। ভবঘুরেটা জন্য মাঝে মাঝে হাসির পাত্রও হতে হয়। কিন্তু পেছনে মানুষ কি নিয়ে হাসলো এসব নিয়ে খুব একটা ভাবি না। ঘুরতে ভালো লাগে নিছক ভালো লাগার জন্য, কোন উদ্দেশ্য থাকে না এতে। এজন্যই হয়তো আমি ভবঘুরে।
এই ভবঘুরেটার জন্যই নীলার সাথে পরিচয়। ওর সাথে পরিচয়টাও একটা জার্নিতে। লঞ্চে করে যেন কোথায় যাচ্ছিলাম। কোথায় যাচ্ছিলাম এটা ঠিক মনে করতে পারছি না,
মনে করার কথাও না, ওইদিন যাওয়া ছিলো উদ্দেশ্যহীন ভাবে। লঞ্চের দোতলার কেবিনের পাশে রেলিং সাইডে একটা চেয়ারের হাত দিয়ে দাড়িয়ে আছি। মোবাইল তো অনেকক্ষন আগে থেকেই বন্ধ করে রাখা। সেদিনের আকাশটা ভিন্ন ছিলো, চাঁদ ছিলো, হালকা বাতাসও ছিলো। ঢেউয়ের কারনে একটা পরপর লঞ্চ কেঁপে উঠছিলো। এই জায়গাটায় দাড়িয়ে লঞ্চের সামনে চোখ রাখা যায়, ঢেউ কেটে কিভাবে লঞ্চ এগিয়ে যায়, শব্দও হচ্ছে বেশ।
রাত আনুমানিক আড়াইটা হবে। আড্ডা দেয়ার মত কাউকে পাচ্ছি না। চায়ের দোকানে ভিড় লেগেই আছে। আড্ডা দিয়ে মজা পাচ্ছিলাম না বলে অন্ধকারে একা দাড়িয়ে। লঞ্চ চলার সময় রেলিং সাইডের লাইটগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। বাতাসের বেগ বেড়ে যাচ্ছে, বৃষ্টির একটা ফোটা এসে নাকে লাগলো। ঝড় কিংবা তুমুল বৃষ্টি হতে পারে যে কোন সময়।
.
ফোটা ফোটা করে বৃষ্টির পরিমান বাড়ছে। মাথার গামছা খুলে নাক মুখ মুছতে মুছতে নদীর ঢেউয়ের দিকে মনোযোগ দিলাম। ঢেউ বেড়ে যাচ্ছে। গামছা উড়ে গেলো, উড়ে গেলো বলতে কয়েকহাত পেছনে আরেকটা চেয়ারে গিয়ে পরলো। ঠিক সামনের চেয়ারে একজনের অবয়ব লক্ষ করলাম। শাড়ী জড়ানো, অন্ধকারে শাড়ীর রংটা বুঝা যাচ্ছে না। চুপচাপ বসে আছে। একবার ভাবলাম কিছু জিজ্ঞাস করি, আবার ভাবলাম সে হয়তো একাকীত্ব অনুভব করছে। তার অনুভূতি নষ্ট করা ঠিক হবে না।
ফিরে এলাম, অনেকটা জোর করেই ফিরে এলাম। ভাবলাম আড্ডা জমাতে পারলে খারাপ হয় না। রাতে জম্পেস আড্ডা হবে, সকালে দুজন দুজনের পথে বেড়িয়া যাবো। পৃথিবীটা গোল, যদি কখনো দেখা হয় হবে, না হলে আপসুস থাকবে না।
একটু এগিয়ে জিজ্ঞাস করলাম-
চা খাবেন?
খাওয়াবেন?
যদি খান।
খাওয়া যায়।
চায়ের ব্যবস্থা করলাম। কেবিনের দরজা খুলে দিলাম। নীল শাড়ী জড়ানো। কেবিনের খোলা দরজার সামনে দুজন দাড়িয়ে চা খাচ্ছি। কোন কথা হচ্ছে না। বুঝলাম অন্ধকারের আড্ডা কখনো আলোতে সম্ভব না। বাহির থেকে দরজা ধাক্কা দিয়ে বন্ধ করে দিলাম। হুম, এখন আড্ডার জন্য পরিবেশ আছে। তবু আমরা চুপচাপ। নীরবতা ভেঙ্গে প্রশ্ন করলো-
কি করেন?
চায়ে চুমুক দিয়ে একটু সময় নিয়ে বললাম, আমি ভবঘুরে। ভবঘুরেরা কিছু করে না।
কোথায় থাকেন?
যখন যেখানে ভালো লাগে।
চলে কিভাবে?
চলবে না কেন? পৃথিবীতে সবকিছুই তো চলছে, কিছুই তো থেমে নেই।
না মানে, আপনার খরচ চলে কিভাবে?
আমার চাহিদা খুব কম, খরচও খুব কম। অল্প কিছু আয় করলেই দিব্যি চলে যায়।
আপনি তো আজব মানুষ।
আজব হওয়ার চেষ্টা করছি।
.
লঞ্চ চলছে বুড়িগঙ্গায়, পঁচা পানির গন্ধ। তবুও আড্ডা থেমে নেই। কারো চোখেই ঘুম নেই।
আস্তে আস্তে সূর্যের আলোয় মেয়েটাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। খুব বেশি কোমলতার ভাব না থাকলেও ওর মাঝে আলাদা কিছু আছে। আর ওর প্রতি আমার টানটা হয়তো নীল শাড়ির জন্যই এতটা।
আমাদের সময় শেষ, চলে যেতে হবে একদিনের আড্ডার সঙ্গীকে ছেড়ে। মনে হচ্ছিলো আমরা অনেক আগে থেকেই পরিচিত। আর সুযোগ থাকলে আড্ডাটা আরও বেশি সময় নিয়ে দেয়া যেতো। বিদায় বলতে পারলাম না একজনও, ইশারায় বিদায় নিয়ে কেবিনে এসে সবকিছু গোছাতে লাগলাম। ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে একবারে অনেকটা শেষ করলাম। গামছাটা মাথায় বেঁধে নিলাম। চাবি জমা দিয়ে বের হয়ে গেলাম। আর পেছনে তাকাইনি। মনে হচ্ছে মেয়েটা আমার পেছন পেছন হাঁটছে। ভয়ে তাকাইনি পেছনে, তাকিয়ে যদি দেখি পেছনে কেউ নাই।
.
রিক্সায় উঠতে গিয়ে বাহুতে একটা কোমল হাতের স্পর্শ। পেছন ঘুরতেই-
মাথায় গামছা বাঁধলে আপনাকে বেশ ভালো লাগে। আবার দেখা হবে।
কোন জবাব দিতে পারলাম না। কোন জবাবও ছিলো না। মেয়েটার নামও জিজ্ঞাস করা হয়নি।
না, তাকে তার নামে ডাকবো না। আমার কাছে তার পরিচয় হবে আমার দেয়া নামে