ভবঘুরে ।। পর্ব-৭ ।।

রিক্সায় উঠার সময় পেছন থেকে বাহুতে হাত রেখে মেয়েটা যখন বলেছিলো- “মাথায় গামছা বাঁধলে আপনাকে বেশ ভালো লাগে। আবার দেখা হবে।তখন কেমন অনুভুতি হয়েছিলো মনে নেই। তবে মাথায় গামছা বাঁধতে গেলেই তার শেষ কথাটা কানের কাছে বেজে ওঠে। মেয়েটার নামও জিজ্ঞাস করা হয়নি, যোগাযোগ করার জন্য কোন ব্যবস্থাও রাখা হয়নি। শুধু বলেছিলা, পৃথিবীটা গোল, আবার দেখা হতে পারে।
মেয়েটার সাথে খুব অল্প সময় কাটানোটা খুব অল্প সময় হলেও মেয়েটাকে নিয়ে ভাবনা অল্প না। ভবঘুরেদের জীবনে ভাবনা খুব কম থাকে, খুব বেশি ভাবনা নিয়ে ভবঘুরে হওয়া যায় না।
কিন্তু আমি মেয়েটাকে নিয়ে বেশিই ভেবে যাচ্ছি। ভবঘুরেদের জীবনের একটা বড় অংশ হচ্ছে অগোছালো। বিছানায় চাদরের খুব অল্প অংশ ঠিক আছে। একপাশ উল্টে গিয়ে তোষক বের হয়ে আছে, অন্যপাশ ফ্লোরে গড়াগড়ি খাচ্ছে। খুব অল্প অংশ ঠিক থাকাতে শুধু আমার জায়গা না, জায়গা করে নিয়েছে একটা ডায়েরি, একটা গামছা, মোবাইল, পাওয়ার ব্যাংক, পানির বোতল, মানিব্যাগ, আর একটা ল্যাপটপ। ল্যাপটপের চার্জারও অগোছালো, ক্যাবলে বেশ কয়েটা জটলা লেগে আছে। অনেক কষ্টেও সবগুলো জটলা খুলতে না পারে ওই অবস্থাতেই কনেক্ট করে দিয়েছি।
.
ভবঘুরেদের একটা বৈশিষ্ট হচ্ছে নিয়ম না মেনে চলা। বাসার নিয়ম হচ্ছে রাতে মেইন গেট বন্ধ হয়ে যায়, বাইরে যাওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ। একটু চালাকি করে একটা চোরা চাবি কাটিয়ে নিয়েছি রাতে বের হওয়ার জন্য। রাতে বের হওয়াটা যেন একটা অভ্যাসে পরিনত হয়েছে। এটা ঠিক অভ্যাস না, একটা বদ অভ্যাস। ভবঘুরেদের বদ অভ্যাসের শেষ নাই। যতটা সম্ভব কম শব্দ করে গেট খুলে বাইরে বের হলাম, নিজেকে মুক্ত মনে হচ্ছে। রাস্তার লাইটগুলো বন্ধ, আসে পাশের বাড়ি থেকে যা একটু আলো আসছে তাতেই চলে যাচ্ছে। একটু হেঁটে একটা বন্ধ দোকানের সামনে দাড়ালাম। একটা পানির ভাঙ্গা জার উল্টা করে রাখা, একটু নড়লেও বসতে খারাপ লাগছে না। একটা অপরিচিত গলা শোনা যাচ্ছে। অপরিচিত হলেও কেমন জানি খুব পরিচিত মনে হচ্ছে। একটা বাড়ির বন্ধ গেটের সামনে দাড়িয়ে চার তলার বেলকুনিতে দাড়ানো একজনকে চাবি ফালানোর জন্য বলছে। মোবাইলের ফ্লাশ লাইট জ্বালিয়ে এগিয়ে গেলাম। ঠিক মেয়েটার সামনে যখনই দাড়ালাম, উপর থেকে কেউ চাবির রিং ফালালো। আমি তুলে দেয়ার আগেই সে চাবির রিং তুলে আমাকে ধন্যবাদ দিলো। ঠিক আমার পেছনে একজনের উপস্থিতি টের পেলাম। পেছনে না তাকিয়েই পথচারির মত করে সামনে এগিয়ে গিয়ে একটা নির্মাণাধীন বাড়ির সামনে রাখা রডের উপরে বসলাম।
.
এখান থেকে দুজনকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মেয়েটা জিন্স প্যান্ট আর টপস্ পড়া। মেয়েটাকে চিনলাম। হয়তো আমাকে দেখেও চিনতে পারবে। কিন্তু পরিচয় দেয়ার সাহস কিংবা সুযোগ কোনটাই ছিলো না। পাশে মধ্যবয়সী একজন।
তুমি আজিজের মেয়ে না?
জ্বী আঙ্কেল।
এত রাতে বাইরে কেন?
খালামনির বাসায় ছিলাম, এসে দেখি গেট লাগানো। আম্মু চাবি দিছে।
তোমার রেজাল্ট কি?
জ্বী আঙ্কেল, আপনাদের দোয়ায় ভালো।
ভর্তি কোথায় হবে?
ঠিক করিনি, আব্বু সিটি কলেজের জন্য বলছে।
আচ্ছা, যাও। আমি সিগারেট খেতে বের হইছি। বাসায় তো তোমার আন্টির কারনে সিগারেট খেতে পারি না।
.
মধ্যবয়সী লোকটা চলে যেতেই ভাবলাম এগিয়ে গিয়ে বলি,
আমি লঞ্চে গামছা পরা সেই ভবঘুরে ছেলেটা।
কিন্তু ভয় হলো, মেয়েটা চিনতে না পারলে খারাপ কিছু হয়ে যেতে পারে। থেমে গেলাম, বসে রইলাম।
আস্তে আস্তে আসে পাশের বাড়িগুলোর লাইট বন্ধ হয়ে যাচ্ছিলো। রডের উপর থেকে উঠে বন্ধ দোকানের সামনের সেই উল্টা করে রাখা পানির জারের উপরে গিয়ে বসলাম। আকাশের মেঘগুলো কালো হয়ে যাওয়া অন্ধকার বাড়ছে।
বাতাসে সব উল্টে পাল্টে যাওয়ার অবস্থা। এই বৃষ্টিতে এখান থেকে বের হওয়া ঠিক হবে না। এখানে বসার একটা ভালো সুবিধা হচ্ছে চার তলার বেলকুনিতে খুব ভালো ভাবে চোখ রাখা যায়