ভবঘুরে ।। পর্ব-৬ ।।


কলকাতা অতিথি আপ্যায়নের জন্য বেশ বিখ্যাত। ওখানকার একটা বিখ্যাত বাণী হচ্ছে- দাদা, খেয়ে এসেছেন? নাকি গিয়ে খাবেন।
এই হলো কলকাতার কথা। ঢাকা শহরে একটা কথা হচ্ছে, খাওয়াতে পারবো, কিন্তু থাকার জায়গা দিতে পারবো না। মধ্যবিদ্যতে এই শহরে থাকার জায়গটা বেশ কঠিন। মেহমান আসলে ধার করে হলেও আপ্যায়ন করা যায়, কিন্তু তাকে শোবার জায়গাটা দিতে বেশ কষ্ট হয়। আর এই থাকার জায়গাটা যদি হয় আরামবাগ-ফকিরাপুল এলাকায়, তাহলে তো কথাই নাই। এখানবার বাসার রুমগুলো একেকটা মুরগীর ঘরেরর মত। গাদাগাদী করে থাকতে।

.
জনে রুম নিয়ে থাকি। আমার কপাল ভালো বলতে হবে, রুমগুলো মোটামুটি ভালো সাইজেরই। টা রুম আবার টিভি ডাইনিং রুম হিসাবে ব্যবহার করার সাহসও পাচ্ছি।
কয়দিন ধরে টানা ছুটি, আমি বাদে সবাই গ্রামে গেছে। রুমে আমি একা। একা বলতে রুমে একা দখল করে আছি।
এই মধ্য রাতটা আমার জন্য বেশ সমস্যার, হুট করে মাথায় উল্টাপাল্টা ভুত চেপে উঠে। বেট ছেড়ে ল্যাপটপ নিয়ে বসলাম টিভি রুমে। এই রুমে একটা ছোট খাটো বেড থাকার পরেও ফ্লোরে বসলাম। ফ্লোরে না বলে একাকীত্বটা অনুভব করা যায় না। আর আমি তো একাকীত্বটা অনুভব করতে চাই।
এই বাসার একটা বড় সমস্যা হচ্ছে ১১টার পরে মেইন গেট লাগিয়ে দেয়। ২দিন আগেও গেটের একটা বিকল্প চাবি আমার কাছে ছিলো। যা গত / মাস ধরে ব্যবহার করছি। কিভাবে যেন গোপন ঘটনা ফাঁস হয়ে যায়। নতুন তালা দেয়া হয়েছে।
.
একটা সময় ছিলো মধ্যরাতে বাসা থেকে বেড়িয়ে যেতাম। খুব বেশি দূরে না, মহল্লা থেকে বেরিয়ে সোজা ডালাস মোড়। চায়ের দোকানে। দোকানটা অনেকদিনের পরিচিত। আমি মধ্যরাতের কাষ্টমার, দোকানদারও এটা ভালো করে জানে। আসে পাশের সব টং দোকানগুলো যখন একে একে বন্ধ হয়ে যেতো, তখনও দোকানদার আমার অপেক্ষা করতো।
কিন্তু এখন আর করে না। করবেই বা কেন, আমিও তো আর নিয়মিত যাই না, আর যাবোও বা কেন? দোতলার বেলকুনিতে নীল শাড়ী জড়ানো নীলাকে তো আর দেখা যায় না। দেখা যাবেও বা কিভাবে? ওরা তো অনেক আগেই চলে গেছে।
.
সেদিন বাসা ঝাড়ু দিতে গিয়ে অনেক অপ্রয়োজনীয় এটা সেটা ফেলে দিতে হয়েছিলো। টুকটাক প্রয়োজনীয় কিছুও ছিলো, যেগুলো আবার যত্ন করে রেখে দিছে। ওগুলো ফেলে দেয়া যাবে না, নতুন কাউকেও দেয়া যাবে না। একটা বক্সে প্যাক করা রিং, খুব চিকন সিলভার কালারের, জোড়ার দিকটায় দুইটা ছোট ছোট পাথর বসানো। দামটা শুনলে বলবেন, এই ব্যাটা চাপাবাজি করে, আর না হলে ভাববেন বড় সাইজের একটা ঠক খাইছে।
কিন্তু ওটা কেনার গল্পটা শুনলে অন্য কথা ভাববেন। ওটা কেনান পরে নীলার সাথে অনেকবারই দেখা হয়। কখনো বা নিতে মনে ছিলো না, আবার কখনো বা সাথে নিয়ে গিয়েও দিতে মনে ছিলো না। অনেকদিন ধরেই আমার রুমে পরে আছে। বেশ কিছুদিন অবহেলিত ভাবে থাকলেও এখন থেকে বেশ যত্নে থাকবে। ভাবছি ওটা ট্রাভেল ব্যাগে রাখবো। কোথাও ট্যুরে বের হলে সাথে সাথে থাকবে। পৃথিবীটা গোল, পথ চলতে চলতে হয়তো কোনদিন নীলার সাথে দেখা হয়েও যেতে পারে।
.
আচ্ছা এমন তো হয়, জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া অনেকের সাথেই হুট করে আবার দেখা হয়। হয়তো নীলার সাথেও আমার এমন করেই দেখা হবে। সেদিন হয়তো নীলা নীল শাড়ী জড়ানো থাকবে না। সেদিন হয়তো নীলাকে নীলা বলে ডাকলে সাড়া দিবে না, ওর নাম ধরেই ডাকতে হবে