ভবঘুরে ।। পর্ব-৪ ।।

অন্ধকার রুম। লাইট বন্ধ। মৃদু ভাবে ফ্যান চলছে। ল্যাপটপের ডিসপ্লের আলো বেশ কমানো। আলো বেশি হলে নিজেকে একা অনুভব করা যায় না। ছোট্ট একটা বিছানা। বিছানার উপরে দুইটা বালিশ, মানিব্যাগ, লন্ড্রী করা কাপড়, ল্যাপটপের চার্জার, হুট হাট নোট করার জন্য খাতা-কলম, বেশ কয়েকটা বই রাখার পরে আমার শোয়ার জায়গা খুব কমই থাকে।
বিছানা বলতে মেসে যে খাট বা চৌকিগুলো ব্যবহার করা হয় সেটা।
চাইলে বড় খাট আনা যায়, কিন্তু তাতে আবার মেস লাইফের ফিল আসে না। আবার বিছানা থেকেও ওইসব সরিয়ে নিজে শোয়ার জায়গাটা বড় করা যায়, কিন্তু করছি না। ওগুলোর প্রতিটাই প্রয়োজনীয়। এখন আর চশমা ব্যবহার করতে হয় না, করতে হয় না বলতে করি না। বিরক্তি লাগে খুব। চশমা থাকলে ওটাও হয়তো বিছানায় ছোট্ট একটু জায়গা পেতো।
.
এই যে অন্ধকারে টাইপ করছি কোন কষ্ট হচ্ছে না। লেখার জন্য যতগুলো বাটনে চাপ দিতে হয়, সেগুলো বেশ আয়ত্বে আছে। বিশ্বাস করুন, এই লেখা আমি ভেবে ভেবে লিখছি না। কি-বোর্ডর উপর হাত ছেড়ে দিলাম, আঙ্গুলগুলো এখানে সেখানে ছোটাছুটি করছে।
মন খুলে আড্ডা কবে দিয়েছি, তাও মনে নাই। ইদানিং প্রয়োজন ছাড়া বাইরেও যাই না। আগে অনেক রাত পর্যন্ত বাইরে থাকতাম। গভীর রাতে কমলাপুর রেল স্টেশনে ঢোকা ছিলো নিয়মিত অভ্যাসের মত। রাত ১১ টার ট্রেনের টিকেট কেটে স্টেশনে এসে দেখে ট্রেন আসবে ৪টার দিকে। এই মানুষগুলো কিভাবে স্টেশনে বসে বসে রাত কাটায়, কেউ বা গল্পের বই পড়ে। কেউ কেউ ফোনে নব বধুর সাথে গল্পে মসগুল হয়ে যায়।
.
কিছুদিন আগে প্লাস্টিকের স্যান্ডেল, জিন্স প্যান্ট, আর সাদা টি-শার্টের উপর ঢেলা শার্ট গায়ে বঙ্গ ভবনের দক্ষিণ পাশের রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম। সাথে ঘড়ি/মোবাইল ছিলো না। ভবঘুরে ভাব নিয়ে গভীর রাতে বাইরে বের হলে সাথে ওই ঝামেলা দুটো সাথে রাখতে হয় না। মোবাইল থাকলে আমাকে আমার মত হাঁটতে বাঁধা দিবে, আর ঘড়িটা বারবার বাসায় ফেরার তারা দিবে। তখন কম করে হলেও রাত টা হবে। সারাদিনের ঢাকা আর রাতের ঢাকার মধ্যে অনেক পার্থক্য থাকে। খুব কাছে থেকে না দেখলে একদমই বুঝা যাবে না। দিনের সাথে রাতের কোন মিল নেই। ছিনতাইকারী সংক্রান্ত ঝামেলাটা না হলে প্রতি রাতেই ঢাকা শহর দেখতে বের হতাম। দিনের ঢাকায় আসলে কিছুই নেই। ঢাকার সৌন্দর্যটা রাতেই দেখা যায়।
.
হাত আর সামনে যেতে চাচ্ছে না। পোস্ট দেয়ার আগে বানানও চেক করা হবে না। পিসি অফ করে দিবো। হ্যাঁ, এটাও কিন্তু আমার বিছানাতেই জায়গা করে নিবে। ছোট্ট একটা বিছানায় কতকিছু, ভাবতেই অবাক লাগে। সবকিছুতে জায়গা করে নেয়ার পরে নিজে শোবার জায়গটা খুবই কম। তবু তৃপ্তি কম না। লাইট অফ করা আছে, ফ্যানের স্পিড ফুল করে কাঁথা গায়ে দিবো। একটা বালিশ মাথায় নিচে, আরেকটা পায়ের নিচে দিয়ে অনেকক্ষন চুপচাপ থাকবো। হুট করে ঘুমিয়ে যাবো। ঘুমালেই স্বপ্ন। স্বপ্ন দেখবো রাতের ঢাকা।
লাইটপোস্টের আলো পিচ ঢালা রাস্তা পর্যন্ত আসতে কষ্ট হচ্ছে। চারপাশ চুপচাপ। ওই দূরে একটা টং দোকান দেখা যাচ্ছে। আমি একটা ল্যাম্পপোস্টের সামনে দাড়ানো। কুহু কুহু করে বার ডাক দিয়ে বিড়ালের মত বার ডাকবো। এটাকে প্রেম সংকেত বলে। নীলা খুব ভালো করেই জানে এই সংকেতটা। ল্যাম্পপোস্টের সামনে দাড়িয়ে এমন সংকেত দিলে নীলা দো'তলার বারান্দায় এসে দাড়ায়। চুপচাপ আমাকে দেখতে থাকে। এই সময়টা নীলা গাড়ো নীল রংয়ের শাড়ী গায়ে জড়িয়ে বারান্দায় আসে। ওর নামটা আসলে নীলা না। নীল রংয়ের আড়ালে আসল নামটা ঢেকে গেছে।
আমি আস্তে আস্তে টং দোকানের দিকে হাঁটবো। আর ভাবতে থাকবো, দোতলায় যেটা দেখেছি সেটা নিছক প্রতিবিম্ব। নীলা তো অনেক আগেই ওই বাড়িটা ছেড়ে গেছে। দোকানদার সবকিছু গোছাতে থাকবে। আমাকে দেখে বলবে-
অনেকদিন পরে দেখলাম। এইদিকে কম আসেন নাকি?
আমি কিছু বলতে পারবো না। প্যাকেট খুলে একটা সিগারেট বের করে জ্বালাবো (নিছক স্বপ্ন) ধোয়া ছাড়বো ওই দোতলা বাড়িটার দিকে তাকিয়ে। বারান্দার লাইট বন্ধ। নীলার বড্ড অপছন্দ হওয়ায় ওখানে সিগারেট জ্বালানো যেতো না। মাঝ বয়সী দোকানদার আমার জন্য এই সময়টাতে / কাপ চা ফ্লাস্কে রেখে দিতেন। নিজ হাতে কাপে ঢালতাম আর দোতলা বাড়িটার দিকে তাকিয়ে থাকতাম